১২:২১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

‎গৌরনদীতে সকল রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থান চাই; গণতন্ত্র, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে একটি সময়োপযোগী ভাবনা

লেখক: সোলায়মান তুহিন, ‎গৌরনদী, বরিশাল।
‎বরিশালের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গৌরনদী শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে গৌরনদীর রাজনীতি সবসময় জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে গৌরনদীর মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এই জনপদের রাজনীতি ক্ষমতার নয়; আদর্শ, ত্যাগ ও জনসম্পৃক্ততারও ইতিহাস বহন করে।

‎আজ প্রশ্ন হচ্ছে গৌরনদী কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিভেদ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না? আমার বিশ্বাস, উত্তরটি অবশ্যই হ্যাঁ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও পারস্পরিক সহনশীলতা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন গৌরনদীতেও ঘটতে হবে।

‎আজ প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ সকল বৈধ রাজনৈতিক দল নিজস্ব আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করবে, কিন্তু জনস্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সহাবস্থান। ভিন্নমত গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না হয়। গৌরনদীর চায়ের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে সবাই যেন নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন এমন পরিবেশই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

‎ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গৌরনদীর রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের অভিমত। ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করলেও বড় ধরনের সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় অনেকের মতে, তাঁর সমন্বয়মূলক নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এলাকায় সহনশীল পরিবেশ বজায় রয়েছে। অনেকে তাঁকে শুধু দলীয় নেতা নয়, বরং জনবান্ধব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও দক্ষ সংগঠক হিসেবেও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

‎তবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। গৌরনদীর রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রশ্নটি অতীতের অভিজ্ঞতার কারণেই আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে দেশের রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া ছিলেন, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা স্বজনের জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। মামলা পরিচালনা ও চিকিৎসা ব্যয়ে অসংখ্য পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী এখনো সেই সময়ের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পেক্ষাপট পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা এ ধরনের পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি হবে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার ভিত্তিতে; মামলা, হামলা কিংবা বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয়।

‎গৌরনদীর মানুষ উন্নত সড়ক, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, কর্মসংস্থান এবং মাদকমুক্ত সমাজ চায়। এসব বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন থাকার কথা নয়। জনস্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন।

‎শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের নেতৃত্ব। তাদের রাজনীতি শেখার অধিকার রয়েছে, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাদের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ। দলমত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের আবার পড়ার টেবিল ও খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা।

‎একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কারণ গণমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয় এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে। গৌরনদীর মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। অতীতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি, মামলা ও হয়রানির নানা অভিযোগ ছিল। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। তবে আত্মসমালোচনাও জরুরি। কোনো সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নীরব থাকেন অথবা তা আড়াল করেন, তবে তিনি জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেন। সাংবাদিকের কলম কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়; সত্য, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের জন্য। ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী সবার ক্ষেত্রেই একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করাই প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিচয়।

‎সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষক, আলেম, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে সম্প্রীতি রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার।

‎গৌরনদীর রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে এখন সময় এসেছে একটি সহনশীল, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও সুদৃঢ় করার। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ভিন্নমতের সহাবস্থানে, আর সেই সহাবস্থান টিকিয়ে রাখতে সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‎আমার বিশ্বাস, গৌরনদীর রাজনৈতিক সহাবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে নিচের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। ১. সকল রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। ২. রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহিংসতা ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করতে হবে। ৩. নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। ৪. জনস্বার্থের উন্নয়নমূলক বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সহিংসতামুক্ত রাখতে হবে। ৬. ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. তরুণদের ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। ৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা পরিহার করতে হবে। ৯. প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রতি সকলের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। ১০. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে সম্মান করতে হবে। ১১. জাতীয় দিবস ও স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ১২. সর্বোপরি, গৌরনদীর স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।


‎গৌরনদীর রাজনীতি বহু বছরের ঐতিহ্য বহন করে। এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থান।

‎গৌরনদী কারও একার নয়; এটি বিএনপিরও, জামায়াতেরও, গণঅধিকার পরিষদেরও, এনসিপিরও, ইসলামী আন্দোলনেরও—সর্বোপরি এটি গৌরনদীর মানুষের। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিভেদে নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানে রূপ নেয়। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা এমন একটি গৌরনদী রেখে যেতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একজন মানুষের সততা, যোগ্যতা ও মানবিকতাই হবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। গৌরনদীর মানুষ উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের রাজনীতি দেখতে চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকাই হতে পারে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক গৌরনদী গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপডেট সময় ০৯:০৮:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
৬ বার পড়া হয়েছে

‎গৌরনদীতে সকল রাজনৈতিক সংগঠনের সহাবস্থান চাই; গণতন্ত্র, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের স্বার্থে একটি সময়োপযোগী ভাবনা

আপডেট সময় ০৯:০৮:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

লেখক: সোলায়মান তুহিন, ‎গৌরনদী, বরিশাল।
‎বরিশালের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত গৌরনদী শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি দক্ষিণাঞ্চলের রাজনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভৌগোলিক অবস্থান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব এবং রাজনৈতিক সচেতনতার কারণে গৌরনদীর রাজনীতি সবসময় জাতীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে। ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে গৌরনদীর মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। এই জনপদের রাজনীতি ক্ষমতার নয়; আদর্শ, ত্যাগ ও জনসম্পৃক্ততারও ইতিহাস বহন করে।

‎আজ প্রশ্ন হচ্ছে গৌরনদী কি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু বিভেদ থাকবে না; প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না? আমার বিশ্বাস, উত্তরটি অবশ্যই হ্যাঁ। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে নতুন প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। মানুষ এমন একটি বাংলাদেশ চায়, যেখানে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন ও পারস্পরিক সহনশীলতা বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই পরিবর্তনের প্রতিফলন গৌরনদীতেও ঘটতে হবে।

‎আজ প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, গণঅধিকার পরিষদ, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ সকল বৈধ রাজনৈতিক দল নিজস্ব আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করবে, কিন্তু জনস্বার্থে একসঙ্গে কাজ করবে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সহাবস্থান। ভিন্নমত গণতন্ত্রের দুর্বলতা নয়, বরং শক্তি। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন ব্যক্তিগত শত্রুতায় পরিণত না হয়। গৌরনদীর চায়ের দোকান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে সবাই যেন নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে নির্ভয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন এমন পরিবেশই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

‎ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গৌরনদীর রাজনৈতিক পরিবেশ তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলের অভিমত। ভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ কর্মসূচি পালন করলেও বড় ধরনের সংঘাতের খবর পাওয়া যায়নি। বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী জহির উদ্দিন স্বপন নির্বাচিত হয়ে বর্তমানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয় অনেকের মতে, তাঁর সমন্বয়মূলক নেতৃত্ব ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে এলাকায় সহনশীল পরিবেশ বজায় রয়েছে। অনেকে তাঁকে শুধু দলীয় নেতা নয়, বরং জনবান্ধব রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও মূল্যায়ন করেন। একই সঙ্গে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও দক্ষ সংগঠক হিসেবেও স্থানীয় পর্যায়ে তাঁর পরিচিতি রয়েছে।

‎তবে একটি গণতান্ত্রিক সমাজে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার দায়িত্ব কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। গৌরনদীর রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রশ্নটি অতীতের অভিজ্ঞতার কারণেই আরও গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময়ে দেশের রাজনীতিতে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, হামলা, হয়রানি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। অনেকেই দীর্ঘদিন বাড়িছাড়া ছিলেন, সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা স্বজনের জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। মামলা পরিচালনা ও চিকিৎসা ব্যয়ে অসংখ্য পরিবার আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক নেতাকর্মী এখনো সেই সময়ের শারীরিক ও মানসিক ক্ষত বহন করছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পেক্ষাপট পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা এ ধরনের পরিস্থিতির আর পুনরাবৃত্তি হবে না। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু প্রতিহিংসা থাকবে না। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হবে নীতি, কর্মসূচি ও জনসেবার ভিত্তিতে; মামলা, হামলা কিংবা বিদ্বেষের ভিত্তিতে নয়।

‎গৌরনদীর মানুষ উন্নত সড়ক, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, কর্মসংস্থান এবং মাদকমুক্ত সমাজ চায়। এসব বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বিভাজন থাকার কথা নয়। জনস্বার্থে সব রাজনৈতিক দলের ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন।

‎শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের নেতৃত্ব। তাদের রাজনীতি শেখার অধিকার রয়েছে, তবে তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তাদের শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও সুন্দর ভবিষ্যৎ। দলমত নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের আবার পড়ার টেবিল ও খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনতে হবে। সুস্থ সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধুলা ও নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের রাষ্ট্রনায়ক, প্রশাসক, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা।

‎একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কারণ গণমাধ্যম জনগণের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেয় এবং রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করে। গৌরনদীর মতো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। অতীতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ, ভয়ভীতি, মামলা ও হয়রানির নানা অভিযোগ ছিল। এসব অভিজ্ঞতা আমাদের মনে করিয়ে দেয় স্বাধীন সাংবাদিকতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হতে পারে না। তবে আত্মসমালোচনাও জরুরি। কোনো সাংবাদিক যদি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে অন্যায়, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে নীরব থাকেন অথবা তা আড়াল করেন, তবে তিনি জনগণের বিশ্বাসের সঙ্গে প্রতারণা করেন। সাংবাদিকের কলম কোনো ব্যক্তি বা দলের জন্য নয়; সত্য, ন্যায়বিচার ও জনস্বার্থের জন্য। ক্ষমতাসীন কিংবা বিরোধী সবার ক্ষেত্রেই একই নৈতিক মানদণ্ড প্রয়োগ করাই প্রকৃত সাংবাদিকতার পরিচয়।

‎সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষক, আলেম, সংস্কৃতিকর্মী, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে সম্প্রীতি রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার।

‎গৌরনদীর রাজনৈতিক ঐতিহ্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে এখন সময় এসেছে একটি সহনশীল, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি আরও সুদৃঢ় করার। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ভিন্নমতের সহাবস্থানে, আর সেই সহাবস্থান টিকিয়ে রাখতে সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

‎আমার বিশ্বাস, গৌরনদীর রাজনৈতিক সহাবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই করতে নিচের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। ১. সকল রাজনৈতিক দলের পারস্পরিক সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। ২. রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সহিংসতা ও উসকানিমূলক বক্তব্য পরিহার করতে হবে। ৩. নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। ৪. জনস্বার্থের উন্নয়নমূলক বিষয়ে দলমত নির্বিশেষে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। ৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক সহিংসতামুক্ত রাখতে হবে। ৬. ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. তরুণদের ইতিবাচক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় উৎসাহিত করতে হবে। ৮. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা পরিহার করতে হবে। ৯. প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার প্রতি সকলের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। ১০. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাকে সম্মান করতে হবে। ১১. জাতীয় দিবস ও স্থানীয় উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ১২. সর্বোপরি, গৌরনদীর স্বার্থকে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।


‎গৌরনদীর রাজনীতি বহু বছরের ঐতিহ্য বহন করে। এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থান।

‎গৌরনদী কারও একার নয়; এটি বিএনপিরও, জামায়াতেরও, গণঅধিকার পরিষদেরও, এনসিপিরও, ইসলামী আন্দোলনেরও—সর্বোপরি এটি গৌরনদীর মানুষের। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বিভেদে নয়, গণতান্ত্রিক সহাবস্থানে রূপ নেয়। আগামী প্রজন্মের জন্য আমরা এমন একটি গৌরনদী রেখে যেতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয় নয়, একজন মানুষের সততা, যোগ্যতা ও মানবিকতাই হবে তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। গৌরনদীর মানুষ উন্নয়ন, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের রাজনীতি দেখতে চায়। সেই প্রত্যাশা পূরণে সকল রাজনৈতিক দল, প্রশাসন, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং সচেতন মানুষের সম্মিলিত দায়িত্বশীল ভূমিকাই হতে পারে একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক গৌরনদী গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি।