০৫:২৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

বাবুগঞ্জে ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত

❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাড়ে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পুণ্যস্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। হিন্দুশাস্ত্র মতে চৈত্রের অশোকা অষ্টমী তিথির লগ্ন অনুসারে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্গাসাগর দিঘীতে ওই স্নান উৎসব চলে। এসময় হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় দিনভর মুখরিত হয় গোটা এলাকা। স্নান উৎসবকে ঘিরে দিঘীর পাড়ে পূজাপাঠ চক্র এবং পার্শ্ববর্তী চন্দ্রদ্বীপ হাইস্কুল ও কলেজ মাঠে দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

সনাতন হিন্দু ধর্মবিশ্বাস মতে প্রতিবছর চৈত্রমাসের অশোকা অষ্টমী তিথিতে নিজের অতীত জীবনের পাপ-পঙ্কিলতা ধুয়েমুছে নতুন পরিশুদ্ধ জীবন লাভের আশায় বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে পুণ্যস্নান করতে আসেন সনাতন ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা। এসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিনভর প্রায় লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চলছে এই রেওয়াজ। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার স্নান উৎসবে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ, ডিবি, র‍্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছে সেনাবাহিনী। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় খুশি স্নানে আসা ভক্তরা।

গোপালগঞ্জ থেকে আসা সীমা রাণী দাস বলেন, প্রতিবছরই এই দুর্গাসাগর দিঘীতে আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্নান করতে আসি। মনের মধ্যে কিছুটা ভয় এবং অজানা আশঙ্কা কাজ করলেও এখানে আসার পরে সেটা দূর হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট সদস্য উপস্থিত দেখে আমাদের ভয় কেটে গেছে। এছাড়া এবারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। অভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বরগুনা থেকে আসা সনাতন ভক্ত অশোক কুমার বিশ্বাস।

স্নান ও মেলা প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক সুলতান আহমেদ খান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দুর্গাসাগরে স্নানে আসা হিন্দু ভাইবোনদের খোঁজখবর নিয়েছি। তাদের সাথে কথা বলেছি। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবার তারা যথেষ্ট খুশি। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা এবং আমাদের দলীয় স্বেচ্ছাসেবকরা আয়োজকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, এই নীতিতে সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চাই আমরা।’

স্নান উৎসবসহ মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি এবং প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের শেষ রাজা সতীন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছেলে রাজা দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘বরিশাল ছিল প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রাজধানী ছিল বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায়। আমার পূর্বপুরুষ চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ণ রায় ১৭৮০ সালে এই বিশালাকৃতির দিঘীটি খনন করেন। চৈত্রের খরা মৌসুমে রাজ্যের বিভিন্ন জলাশয় শুকিয়ে গেলে প্রজাদের পানির অভাব দূর করতে তার স্ত্রী রাণী দুর্গামতি একটি বড় দিঘী খননের পরামর্শ দেন। এই প্রস্তাব রাজার পছন্দ হলে রাণী দুর্গামতি যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন ততদূর এলাকা নিয়ে একটি দিঘী খনন করার নির্দেশ দেন রাজা। এ কারণে রাণীর নামানুসারে প্রায় অর্ধশত একর জায়গা জুড়ে খননকৃত এই বিশালাকৃতির দিঘীর নামকরণ হয় দুর্গাসাগর দিঘি। এরপর থেকে এই ঐতিহাসিক দিঘীতেই অশোকা অষ্টমীর পূজা এবং সনাতন ধর্মীয় পুণ্যস্নান রীতি পালন হয়ে আসছে।’

রাজা দিলীপ কুমার রায় আরও বলেন, ‘দুর্গাসাগরের স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে এবারও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু সারাদিনে এখানে লাখের বেশি লোকের সমাগম হয় সেহেতু তাদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কমিটিতে স্থানীয় কয়েকশো স্বেচ্ছাসেবক রাখা হয়েছে। এছাড়াও স্নানের পরে মহিলাদের কাপড় পাল্টানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে এই পুণ্যস্নান উৎসবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছে। দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সনাতনী এই ধর্মীয় উৎসবকে সফল করার জন্য আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’ #

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপডেট সময় ০৩:২৩:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
৪২ বার পড়া হয়েছে

বাবুগঞ্জে ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পুণ্যস্নান অনুষ্ঠিত

আপডেট সময় ০৩:২৩:০০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাড়ে ৩০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পুণ্যস্নান উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছে। হিন্দুশাস্ত্র মতে চৈত্রের অশোকা অষ্টমী তিথির লগ্ন অনুসারে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) ভোর ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দুর্গাসাগর দিঘীতে ওই স্নান উৎসব চলে। এসময় হাজার হাজার মানুষের পদচারণায় দিনভর মুখরিত হয় গোটা এলাকা। স্নান উৎসবকে ঘিরে দিঘীর পাড়ে পূজাপাঠ চক্র এবং পার্শ্ববর্তী চন্দ্রদ্বীপ হাইস্কুল ও কলেজ মাঠে দিনব্যাপী মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

সনাতন হিন্দু ধর্মবিশ্বাস মতে প্রতিবছর চৈত্রমাসের অশোকা অষ্টমী তিথিতে নিজের অতীত জীবনের পাপ-পঙ্কিলতা ধুয়েমুছে নতুন পরিশুদ্ধ জীবন লাভের আশায় বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশা ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহাসিক দুর্গাসাগর দিঘীতে পুণ্যস্নান করতে আসেন সনাতন ভক্ত ও পুণ্যার্থীরা। এসময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দিনভর প্রায় লাখো মানুষের সমাগম ঘটে এখানে। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে চলছে এই রেওয়াজ। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার স্নান উৎসবে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ, ডিবি, র‍্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকের পাশাপাশি শৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করেছে সেনাবাহিনী। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় খুশি স্নানে আসা ভক্তরা।

গোপালগঞ্জ থেকে আসা সীমা রাণী দাস বলেন, প্রতিবছরই এই দুর্গাসাগর দিঘীতে আমার পরিবারের সবাইকে নিয়ে স্নান করতে আসি। মনের মধ্যে কিছুটা ভয় এবং অজানা আশঙ্কা কাজ করলেও এখানে আসার পরে সেটা দূর হয়েছে। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যথেষ্ট সদস্য উপস্থিত দেখে আমাদের ভয় কেটে গেছে। এছাড়া এবারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ভালো ছিল। অভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বরগুনা থেকে আসা সনাতন ভক্ত অশোক কুমার বিশ্বাস।

স্নান ও মেলা প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জ উপজেলা বিএনপির আহবায়ক সুলতান আহমেদ খান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দুর্গাসাগরে স্নানে আসা হিন্দু ভাইবোনদের খোঁজখবর নিয়েছি। তাদের সাথে কথা বলেছি। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবার তারা যথেষ্ট খুশি। অনুষ্ঠানের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপির পক্ষ থেকে আমরা এবং আমাদের দলীয় স্বেচ্ছাসেবকরা আয়োজকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার, এই নীতিতে সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়তে চাই আমরা।’

স্নান উৎসবসহ মেলার আয়োজক কমিটির সভাপতি এবং প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের শেষ রাজা সতীন্দ্র নারায়ণ রায়ের ছেলে রাজা দিলীপ কুমার রায় বলেন, ‘বরিশাল ছিল প্রাচীন চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রাজধানী ছিল বাবুগঞ্জ উপজেলার মাধবপাশায়। আমার পূর্বপুরুষ চন্দ্রদ্বীপ রাজ্যের পঞ্চদশ রাজা শিব নারায়ণ রায় ১৭৮০ সালে এই বিশালাকৃতির দিঘীটি খনন করেন। চৈত্রের খরা মৌসুমে রাজ্যের বিভিন্ন জলাশয় শুকিয়ে গেলে প্রজাদের পানির অভাব দূর করতে তার স্ত্রী রাণী দুর্গামতি একটি বড় দিঘী খননের পরামর্শ দেন। এই প্রস্তাব রাজার পছন্দ হলে রাণী দুর্গামতি যতদূর হেঁটে যেতে পারবেন ততদূর এলাকা নিয়ে একটি দিঘী খনন করার নির্দেশ দেন রাজা। এ কারণে রাণীর নামানুসারে প্রায় অর্ধশত একর জায়গা জুড়ে খননকৃত এই বিশালাকৃতির দিঘীর নামকরণ হয় দুর্গাসাগর দিঘি। এরপর থেকে এই ঐতিহাসিক দিঘীতেই অশোকা অষ্টমীর পূজা এবং সনাতন ধর্মীয় পুণ্যস্নান রীতি পালন হয়ে আসছে।’

রাজা দিলীপ কুমার রায় আরও বলেন, ‘দুর্গাসাগরের স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে এবারও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। যেহেতু সারাদিনে এখানে লাখের বেশি লোকের সমাগম হয় সেহেতু তাদের নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি কমিটিতে স্থানীয় কয়েকশো স্বেচ্ছাসেবক রাখা হয়েছে। এছাড়াও স্নানের পরে মহিলাদের কাপড় পাল্টানোর জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় সাড়ে ৩০০ বছর ধরে এই পুণ্যস্নান উৎসবে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে আসছে। দলমত ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সনাতনী এই ধর্মীয় উৎসবকে সফল করার জন্য আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ।’ #