০৪:১৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

আহমেদ মুন্না’র কলামঃ বিদ্যুতের দুরবস্থা বনাম মন্ত্রীর বয়ান

বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!

মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।

বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা ‘ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া’র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?

হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।

আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #

❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপডেট সময় ১২:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
৫৯ বার পড়া হয়েছে

আহমেদ মুন্না’র কলামঃ বিদ্যুতের দুরবস্থা বনাম মন্ত্রীর বয়ান

আপডেট সময় ১২:২৫:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬

বিগত ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে ক্ষমতার আমলে পরীক্ষায় নকল বন্ধ, মেয়েদের উপবৃত্তি, অবৈতনিক শিক্ষা, জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বেশকিছু সফলতা ছিল বিএনপির। তবে এর বিপরীতে সবচেয়ে বেশি যে কয়েকটা ব্যর্থতার জন্য আজো বিএনপিকে লজ্জিত হতে হয় এরমধ্যে অন্যতম একটা হলো বিদ্যুৎ। সেই আমলে বিদ্যুতের জন্য কানসাট বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের মতো যে লজ্জাজনক ইতিহাস রচিত হয়েছিল এবং সেই ঘটনার জন্য যিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী ছিলেন, সেই অভিযুক্ত ব্যক্তিকেই আবার প্রতিমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি দিয়ে এবার পূর্ণমন্ত্রী করা হলো! অযোগ্য মানুষকে প্রমোশন দিয়ে দ্বিতীয়বার আগের চেয়েও বড় চেয়ারে বসাতে কতখানি চাটুকারিতা তোষামোদির যোগ্যতা থাকা লাগে জানিনা, তবে এটা জানি সেই একই ব্যক্তির জন্য বিএনপি এবারও বড় বিতর্কের মধ্যে পড়তে যাচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে যিনি তীব্র জনরোষের মুখে মন্ত্রীত্ব থেকে অপসারিত হয়েছিলেন তাকেই এবার পূর্ণমন্ত্রী বানিয়ে বিএনপি কী কী সাফল্য অর্জন করবে তা সহজেই অনুমেয়। তিনি যে জ্বালানি এবং বিদ্যুৎ ম্যানেজমেন্টে পুরোপুরি অযোগ্য তার প্রমাণ ইতোমধ্যে তিনি দিয়েছেন। গ্রামে বর্তমানে গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘন্টা লোডশেডিং হচ্ছে। প্রতি ২ ঘন্টা পরপর এক থেকে দেড় ঘন্টা বা কোথাও কোথাও এরচেয়ে বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে। এমনকি রাতের অফ-পিক আওয়ারেও গড়ে ২ থেকে ৩ বার লোডশেডিং হচ্ছে। অথচ বিদ্যুৎ মন্ত্রী বললেন- গ্রামে নাকি লোডশেডিং নাই! বিদ্যুতের লম্বা লম্বা লাইনের জন্য নাকি বিদ্যুৎ ট্রিপ বা ফল্ট করে! এটা কোনো যুক্তি? গ্রামের মানুষ বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে এখন অতিষ্ঠ। সেখানে তাদের সান্ত্বনা দেওয়া বা গ্যাস-কয়লা সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরে কৈফিয়ত দেওয়ার পরিবর্তে তিনি দায় চাপালেন পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের উপরে!

মন্ত্রী হওয়ার পরেই কি মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে যায় নাকি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে ভারসাম্যহীন হলেই তখন তাকে মন্ত্রী হিসেবে মনোনীত করা হয় সেটা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না। তবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এসব অযোগ্য মন্ত্রীদের জন্য বিএনপি এবারও বিতর্কিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন হবে এবং বিপদে পড়বে। দেশে এখন তীব্র গ্যাস সংকট চলছে। ঢাকার অনেক জায়গায় চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়েও গাড়িতে গ্যাস পাচ্ছে না। কিছু কিছু জায়গায় গ্যাসের সামান্য সরবরাহ থাকলেও গ্যাসের চাপ একদম নেই। এদিকে কয়লা মজুদও প্রায় শেষ। বৈদেশিক ঋণের সুদ-আসল পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রায় খালি। ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেলের সরবরাহ নেই। দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লাচালিত। গ্যাস, ডিজেল এবং কয়লার সরবরাহ না থাকলে এগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে। ভারতীয় কোম্পানি আদানি এবং দেশীয় সামিট গ্রুপকে বিশেষ সু্বিধা দেওয়ার জন্য চড়াদামে কেনা বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো এখন দেশের অর্থনীতির গলার কাঁটা। সরকারের জন্য বিরাট বড় বোঝা। ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বিগত দিনে পাচার হয়েছে দেশের কোটি কোটি ডলার।

বিগত পতিত সরকারের আমলে এদেশে আমদানি নির্ভর কয়লা, ডিজেল ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল মূলত একটি দেশকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য। আশাকরি সেই দেশটার নাম বলার আর দরকার নেই। সবাই বুঝতে পারছে। অথচ নদীমাতৃক এবং মৌসুমী বায়ুর এই বাংলাদেশে দরকার ছিল বেশি বেশি জলবিদ্যুৎ এবং বায়ুচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, যা এদেশে সারাবছর বিনামূল্যে পাওয়া যায়। উন্নত বিশ্বের মতো সৌরশক্তি কাজে লাগিয়ে সোলার এনার্জি প্ল্যান্ট নির্মাণ করার দরকার ছিল। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলে বারবার কাঁচামাল আমদানি করা লাগতো না। তবে সেটা না করার পেছনে মূল রহস্য হলো এই ধরনের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে দেশের বিরাট লাভ হলেও ক্ষতি হতো লুটেরাদের। তারা বারবার এলএনজি, গ্যাস, কয়লা, ডিজেল, ইউরেনিয়াম আমদানির নামে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বিদেশে পাচার করতে পারতো না। এদেশের সকল উন্নয়ন হয় মূলত বড় বড় চোর-ডাকাত, লুটেরাদের লুটপাটে সহায়তা করার জন্য আর কিছু উন্নয়ন প্রদর্শনী করার জন্য। সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের স্বার্থে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর স্বার্থে কোনো উন্নয়ন হয় না।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ইউরেনিয়াম আসে বিদেশ থেকে। সেটা যদি না পাওয়া যায় তবে সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের কানাকড়ি মূল্যও নাই। অথচ এই একটা স্বপ্নবিলাসী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ দিয়ে কাপ্তাইয়ের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় কমপক্ষে ১০টা জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা যেতো। এখানে জ্বালানি লাগতো নদীর স্রোত, যা সারাবছরই কমবেশি থাকতো এই নদীমাতৃক বাংলাদেশে। পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে আমি অপ্রয়োজনীয় বলছি না। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সেটা ‘ঋণ নিয়ে ঘি কিনে খাওয়া’র মতো। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। তবে সেটা তাদের জন্যই প্রযোজ্য যেখানে এর কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের খনি বা পর্যাপ্ত জোগান আছে। আমাদের গরীব দেশের বাস্তবতায় স্বপ্নবিলাসী চড়াদামের বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক স্বল্পব্যয়ের বিদ্যুৎকেন্দ্র দরকার। আমাদের সেই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের দরকার, যার কাঁচামাল তথা জ্বালানি আমাদের দেশে পাওয়া যায় বা দেশেই উৎপাদন হয়। অথচ গণহারে নির্মাণ করা হয়েছে সব কয়লা, গ্যাস আর ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র। চিন্তা করা হয়নি এর জ্বালানি কোথা থেকে আসবে। অন্য দেশ যদি না দেয় বা সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় তখন কী হবে। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার আমদানি না থাকলে, ডিজেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ডিজেল না পাওয়া গেলে, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ না থাকলে বিদ্যুৎ কি হাওয়া-বাতাস থেকে আসবে?

হ্যাঁ, হাওয়া-বাতাস থেকেও তো বিনামূল্যে বিদ্যুৎ আসে। তবে অতীতের মারাত্মক লেভেলের দেশপ্রেমিক দাবিদার রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের লাভের স্বার্থে তারা কোনো উইন্ড পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। বিনামূল্যে পানি থেকেও বিদ্যুৎ আসে, সূর্যের আলো থেকেও বিদ্যুৎ আসে। কিন্তু তারা ওয়াটার পাওয়ার প্ল্যান্ট বা সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট নির্মাণ করেনি। কারণ, এতে কোনো জ্বালানি লাগে না। যা লাগে তা প্রকৃতি থেকে বিনামূল্যে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে তো বারবার জ্বালানি আমদানির নামে কেনাকাটায় চরম লাভের ব্যবসাটা আর থাকে না। রাষ্ট্রের টাকা বারবার লুট আর পাচার করার সুযোগটাও তো তবে হাতছাড়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রের হর্তাকর্তা এসব দুর্বৃত্তদের অর্থনৈতিক লুটপাটের এই জটিল অংকটা সাধারণ মানুষ বোঝে না। তারা বুঝতে চায়ও না। তারা শুধু চায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা।

আপনি জনগণের জন্য বেসরকারি কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২৫ টাকা ইউনিট দামে বিদ্যুৎ কিনলেন, নাকি ভারত থেকে বিদ্যুৎ চুরি করে আনলেন, নাকি নিজের কেন্দ্রের টারবাইন চালু রাখতে ৫ টাকা দামের কয়লা-ইউরেনিয়াম আপনি ৫০ টাকায় কিনে বাকি ৪৫ টাকাই আত্মসাৎ করলেন, সেটা দেশের সাধারণ মানুষ বুঝতে চায় না। তারা শুধু নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা চায়। সারা পৃথিবী যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির সন্ধানে ব্যস্ত তখন আমরা ব্যস্ত চেতনার সন্ধানে আর বিরোধী মত দমনে। একদল তো চেতনার লালবাতি জ্বালিয়ে রেখে পালিয়েছে। কিন্তু কথা হলো- ফ্যাসিস্ট, লুটেরা, গণহত্যাকারী যাকে বলা হয় সেই শেখ হাসিনার সরকার যদি নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা দিতে পারে তাহলে আপনারা নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার হয়ে সেটা পারছেন না কেন? জনগণ এই প্রশ্নটা খুব ভালোভাবেই বোঝে। এই প্রশ্নের উত্তরে আপনি ভূগোল অর্থনীতি বুঝিয়ে, জিডিপি বুঝিয়ে, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি বা হরমুজ প্রণালী বুঝিয়ে কিংবা পল্লী বিদ্যুতের লম্বা লাইনের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যেতে পারবেন না। সরকারে থাকলে সব ব্যর্থতার দায় আপনাদের নিতেই হবে। #

❑ আরিফ আহমেদ মুন্না ✍️
সাংবাদিক, লেখক, কবি, কলামিস্ট ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ।
বাবুগঞ্জঃ ১২ আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ।