০৫:৩৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নজরুল বলেছেনেন, ‘তুমি আরেকটা গান শোনাও’

২০০৯ সালের ২১ মে নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের (২৮ জুলাই ১৯৩০-৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪) এই দুর্লভ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেনকবির বকুল। সে বছরই প্রথম আলোর আনন্দ পাতার বিশেষ আয়োজনে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমাকে দেব না ভুলিতে’ শিরোনামে। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘প্রথম আলোকে ফিরোজা বেগম’ শিরোনামে সাক্ষাৎকারটির আরেকটি অনলাইন সংস্করণ দেখা যায়। আজ ফিরোজা বেগমের প্রয়াণ দিবসে সেই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি আবারও অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

কবির বকুল:নজরুলসংগীত ও ফিরোজা বেগম—এটি যেন ঠিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নজরুলের গানকে কণ্ঠে ধারণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্যও আপনার হয়েছিল। কবির সঙ্গে আপনার পরিচয়ের সেই দুর্লভ মুহূর্ত মনে করে যদি একটু স্মৃতিচারণা করতেন।

ফিরোজা বেগম:আমি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে। আমার বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি আইনজীবী। সেই সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি আদালতে কাজ করতেন। আমরা থাকতাম ফরিদপুরে। বিভিন্ন ছুটিতে কলকাতায় ঘুরতে যেতাম। একবার গ্রীষ্মে এক মাস ছুটি পেলাম। ছোট মামা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ করছেন। মামা গান-বাজনা পছন্দ করতেন। আমার এক কাজিন ইমদাদুল হক, পড়ালেখার পাশাপাশি তখন ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতেন। তাঁর ছোট ভাই এম এ হক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন। (পরে তিনি তত্কালীন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।) দুই ভাই গানের ভক্ত। আমার বয়স তখন এগার-বারো হবে। অল ইন্ডিয়া বেতারের সুনীল বোসের সঙ্গে আমার এই দুই ভাইয়ের সুসম্পর্ক ছিল। একবার এক অনুষ্ঠানে সুনীল বোস আমার গান শুনে বললেন, ‘ওকে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একদিন নিয়ে এসো তো। ওর অডিশন নেব। এইচএমভিতেও একদিন নিয়ে এসো। দেখো, ওরা কী বলে।’ তাঁর কথা শুনে আমি বোকা বোকা চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ‘অডিশন’, ‘এইচএমভি’ শব্দগুলো আমার কাছে অপরিচিত। এরপর একদিন ভাই আর মামা মিলে আমাকে এইচএমভিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে ঢুকেই দেখলাম এইচএমভির লোগো কুকুরের ছবিটা। দেখেই বললাম, ‘আরে, আমি তো এই ছবিটা রেকর্ডে দেখেছি।’ ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। এখান থেকেই সেই রেকর্ডগুলো বের হয়।’ শুনে তো আমার গলা শুকিয়ে গেল। এরপর আমাকে রিহার্সেল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেই প্রথম কাজী নজরুল ইসলামকে দেখলাম। উনি তখন এইচএমভির প্রধান প্রশিক্ষক।

ফিরোজা বেগম:সেদিন তিনি ঘিয়া রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আমাকে ডেকে তাঁর পাশে বসালেন। আমি কিন্তু তখনো জানি না—ইনিই কাজী নজরুল ইসলাম। আমি মনে মনে ভীষণ বিরক্ত। একটা রুমে গাদাগাদি করে এত মানুষ! তার ওপর হারমোনিয়ামসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। মামা এইচএমভির এক কর্মকর্তার মাধ্যমে কবিকে জানালেন যে আমার গান শোনাতে নিয়ে এসেছেন। শুনে কাজী নজরুল ইসলাম হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাহ্, বেশ তো। তা কী গান শোনাবে আমাদের?’

কবির বকুল:আপনি তখন গান করেছিলেন?

ফিরোজা বেগম:আমি তাঁর কথার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অনেকটা বিরক্তি নিয়েই গান ধরলাম—‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা/ শুধু চোখে দেখা দিতে এস না’। গানটি খুবই কঠিন। গান শেষ করেই উঠে দাঁড়ালাম, বাইরে চলে আসব। আমাকে কাজী নজরুল ইসলাম হাত টেনে ধরে বসালেন। বললেন, ‘ওরে সর্বনাশ! এ কী গান শোনালে তুমি। এতটুকু মেয়ে এ গান কীভাবে, কোথা থেকে শিখলে?’

একটু চুপ থেকে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, আমার কয়েকটা কথার জবাব দেবে তুমি?’

মাথা নেড়ে বললাম দেব। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ গান তুমি কোথা থেকে শিখেছ? কার কাছ থেকে?’

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপডেট সময় ০৪:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১ বার পড়া হয়েছে

নজরুল বলেছেনেন, ‘তুমি আরেকটা গান শোনাও’

আপডেট সময় ০৪:০০:১৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২০০৯ সালের ২১ মে নজরুলের জন্মজয়ন্তীতে উপমহাদেশের প্রখ্যাত নজরুল সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগমের (২৮ জুলাই ১৯৩০-৯ সেপ্টেম্বর ২০১৪) এই দুর্লভ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেনকবির বকুল। সে বছরই প্রথম আলোর আনন্দ পাতার বিশেষ আয়োজনে সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছিল ‘আমাকে দেব না ভুলিতে’ শিরোনামে। পরবর্তীকালে ২০১৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ‘প্রথম আলোকে ফিরোজা বেগম’ শিরোনামে সাক্ষাৎকারটির আরেকটি অনলাইন সংস্করণ দেখা যায়। আজ ফিরোজা বেগমের প্রয়াণ দিবসে সেই দুর্লভ সাক্ষাৎকারটি আবারও অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

কবির বকুল:নজরুলসংগীত ও ফিরোজা বেগম—এটি যেন ঠিক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। নজরুলের গানকে কণ্ঠে ধারণ করে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিয়েছেন আপনি। কাজী নজরুল ইসলামের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্যও আপনার হয়েছিল। কবির সঙ্গে আপনার পরিচয়ের সেই দুর্লভ মুহূর্ত মনে করে যদি একটু স্মৃতিচারণা করতেন।

ফিরোজা বেগম:আমি রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে। আমার বাবা খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইসমাইল ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম সরকারি আইনজীবী। সেই সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তিনি আদালতে কাজ করতেন। আমরা থাকতাম ফরিদপুরে। বিভিন্ন ছুটিতে কলকাতায় ঘুরতে যেতাম। একবার গ্রীষ্মে এক মাস ছুটি পেলাম। ছোট মামা তখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় এমএ করছেন। মামা গান-বাজনা পছন্দ করতেন। আমার এক কাজিন ইমদাদুল হক, পড়ালেখার পাশাপাশি তখন ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের হয়ে ফুটবল খেলতেন। তাঁর ছোট ভাই এম এ হক কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন। (পরে তিনি তত্কালীন পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন।) দুই ভাই গানের ভক্ত। আমার বয়স তখন এগার-বারো হবে। অল ইন্ডিয়া বেতারের সুনীল বোসের সঙ্গে আমার এই দুই ভাইয়ের সুসম্পর্ক ছিল। একবার এক অনুষ্ঠানে সুনীল বোস আমার গান শুনে বললেন, ‘ওকে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে একদিন নিয়ে এসো তো। ওর অডিশন নেব। এইচএমভিতেও একদিন নিয়ে এসো। দেখো, ওরা কী বলে।’ তাঁর কথা শুনে আমি বোকা বোকা চোখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। ‘অডিশন’, ‘এইচএমভি’ শব্দগুলো আমার কাছে অপরিচিত। এরপর একদিন ভাই আর মামা মিলে আমাকে এইচএমভিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে ঢুকেই দেখলাম এইচএমভির লোগো কুকুরের ছবিটা। দেখেই বললাম, ‘আরে, আমি তো এই ছবিটা রেকর্ডে দেখেছি।’ ভাই বললেন, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। এখান থেকেই সেই রেকর্ডগুলো বের হয়।’ শুনে তো আমার গলা শুকিয়ে গেল। এরপর আমাকে রিহার্সেল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানেই প্রথম কাজী নজরুল ইসলামকে দেখলাম। উনি তখন এইচএমভির প্রধান প্রশিক্ষক।

ফিরোজা বেগম:সেদিন তিনি ঘিয়া রঙের পাজামা-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। মাথায় টুপি, চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। আমাকে ডেকে তাঁর পাশে বসালেন। আমি কিন্তু তখনো জানি না—ইনিই কাজী নজরুল ইসলাম। আমি মনে মনে ভীষণ বিরক্ত। একটা রুমে গাদাগাদি করে এত মানুষ! তার ওপর হারমোনিয়ামসহ নানা বাদ্যযন্ত্র। মামা এইচএমভির এক কর্মকর্তার মাধ্যমে কবিকে জানালেন যে আমার গান শোনাতে নিয়ে এসেছেন। শুনে কাজী নজরুল ইসলাম হো হো করে হেসে উঠলেন। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বাহ্, বেশ তো। তা কী গান শোনাবে আমাদের?’

কবির বকুল:আপনি তখন গান করেছিলেন?

ফিরোজা বেগম:আমি তাঁর কথার উত্তর না দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অনেকটা বিরক্তি নিয়েই গান ধরলাম—‘যদি পরানে না জাগে আকুল পিয়াসা/ শুধু চোখে দেখা দিতে এস না’। গানটি খুবই কঠিন। গান শেষ করেই উঠে দাঁড়ালাম, বাইরে চলে আসব। আমাকে কাজী নজরুল ইসলাম হাত টেনে ধরে বসালেন। বললেন, ‘ওরে সর্বনাশ! এ কী গান শোনালে তুমি। এতটুকু মেয়ে এ গান কীভাবে, কোথা থেকে শিখলে?’

একটু চুপ থেকে তিনি বললেন, ‘আচ্ছা, আমার কয়েকটা কথার জবাব দেবে তুমি?’

মাথা নেড়ে বললাম দেব। তারপর আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ গান তুমি কোথা থেকে শিখেছ? কার কাছ থেকে?’