১০:২৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

বাংলার হারানো ঐতিহ্যের শেষ প্রহরী: ৫০ বছর ধরে বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন সর্বানন্দ মধু

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) অনলাইন নিউজ ডেস্কঃ
প্রযুক্তির ঝলমলে যুগে যখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, তখনও কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স আর হাতে ডুগডুগি নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান ৮১ বছর বয়সী সর্বানন্দ মধু। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ সংস্কৃতি।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি একসময় লেখাপড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খেয়েছেন। তবে জীবনসংগ্রামে হার না মেনে ৫০ বছর আগে যশোরের বেনাপোল থেকে মাত্র ১৮ টাকায় একটি বায়োস্কোপ কিনে শুরু করেন নতুন পথচলা। নিজের বায়োস্কোপের নাম দেন ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’।
এক হাতে ডুগডুগি আর অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় কণ্ঠে গল্প বলতে বলতে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন তিনি। সেই থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজও থামেনি। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রামগঞ্জের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখনও নিয়মিত বায়োস্কোপ প্রদর্শন করেন সর্বানন্দ।
তার বায়োস্কোপে একসঙ্গে পাঁচজন দর্শক ছবি দেখতে পারেন। একসময় মাত্র ৫ থেকে ১০ পয়সা কিংবা এক মুঠো চালের বিনিময়ে বায়োস্কোপ দেখানো হতো। এখন প্রতি দর্শকের জন্য গুনতে হয় ১০ টাকা। তবুও শিশু থেকে বৃদ্ধ—অনেকেই কৌতূহল নিয়ে ভিড় করেন তার বায়োস্কোপের সামনে।
লাল রঙের কাঠের বাক্সের ভেতরে কাপড়ে লাগানো বিভিন্ন ছবি, বাইরে লাগানো হ্যান্ডেল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক দৃশ্য ভেসে ওঠে দর্শকদের চোখে। আর তার সঙ্গে চলে ডুগডুগির তালে তালে মজার বর্ণনা। এই অভিনব উপস্থাপনাই সর্বানন্দকে এলাকায় পরিচিত করেছে ‘কায়দার কায়দা’ নামে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সর্বানন্দ শুধু একজন বায়োস্কোপ শিল্পী নন, তিনি গ্রামীণ ঐতিহ্যের একজন জীবন্ত ধারক ও বাহক। সততা, সরলতা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি সকলের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধার পাত্র।
সর্বানন্দ মধু বলেন, “বায়োস্কোপ দেখিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমার ভালো লাগে। আগের মতো দর্শক না থাকলেও এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আমি এখনও কাজ করে যাচ্ছি।”
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এই প্রবীণ শিল্পী আজও প্রমাণ করে চলেছেন—প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার মাঝেও ঐতিহ্যের আলো কখনও পুরোপুরি নিভে যায় না। সর্বানন্দ মধুর মতো মানুষদের হাত ধরেই গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা বায়োস্কোপ এখনও টিকে আছে মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায়।

নিউজটি শেয়ার করুন:

আপডেট সময় ০৮:১৮:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
৮ বার পড়া হয়েছে

বাংলার হারানো ঐতিহ্যের শেষ প্রহরী: ৫০ বছর ধরে বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন সর্বানন্দ মধু

আপডেট সময় ০৮:১৮:১৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) অনলাইন নিউজ ডেস্কঃ
প্রযুক্তির ঝলমলে যুগে যখন মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর ডিজিটাল বিনোদনের দাপটে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি, তখনও কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স আর হাতে ডুগডুগি নিয়ে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান ৮১ বছর বয়সী সর্বানন্দ মধু। প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপ সংস্কৃতি।
বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার বাগধা গ্রামের বাসিন্দা সর্বানন্দ মধু। অভাব-অনটনের সংসারে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি একসময় লেখাপড়ার বই বিক্রি করে চাল কিনে খেয়েছেন। তবে জীবনসংগ্রামে হার না মেনে ৫০ বছর আগে যশোরের বেনাপোল থেকে মাত্র ১৮ টাকায় একটি বায়োস্কোপ কিনে শুরু করেন নতুন পথচলা। নিজের বায়োস্কোপের নাম দেন ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’।
এক হাতে ডুগডুগি আর অন্য হাতে বায়োস্কোপের হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে ছন্দময় কণ্ঠে গল্প বলতে বলতে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন তিনি। সেই থেকে শুরু হওয়া যাত্রা আজও থামেনি। দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, গ্রামগঞ্জের মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এখনও নিয়মিত বায়োস্কোপ প্রদর্শন করেন সর্বানন্দ।
তার বায়োস্কোপে একসঙ্গে পাঁচজন দর্শক ছবি দেখতে পারেন। একসময় মাত্র ৫ থেকে ১০ পয়সা কিংবা এক মুঠো চালের বিনিময়ে বায়োস্কোপ দেখানো হতো। এখন প্রতি দর্শকের জন্য গুনতে হয় ১০ টাকা। তবুও শিশু থেকে বৃদ্ধ—অনেকেই কৌতূহল নিয়ে ভিড় করেন তার বায়োস্কোপের সামনে।
লাল রঙের কাঠের বাক্সের ভেতরে কাপড়ে লাগানো বিভিন্ন ছবি, বাইরে লাগানো হ্যান্ডেল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক দৃশ্য ভেসে ওঠে দর্শকদের চোখে। আর তার সঙ্গে চলে ডুগডুগির তালে তালে মজার বর্ণনা। এই অভিনব উপস্থাপনাই সর্বানন্দকে এলাকায় পরিচিত করেছে ‘কায়দার কায়দা’ নামে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, সর্বানন্দ শুধু একজন বায়োস্কোপ শিল্পী নন, তিনি গ্রামীণ ঐতিহ্যের একজন জীবন্ত ধারক ও বাহক। সততা, সরলতা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার কারণে তিনি সকলের কাছে সমানভাবে শ্রদ্ধার পাত্র।
সর্বানন্দ মধু বলেন, “বায়োস্কোপ দেখিয়ে মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই আমার ভালো লাগে। আগের মতো দর্শক না থাকলেও এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে আমি এখনও কাজ করে যাচ্ছি।”
বাংলার লোকজ সংস্কৃতির এই প্রবীণ শিল্পী আজও প্রমাণ করে চলেছেন—প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার মাঝেও ঐতিহ্যের আলো কখনও পুরোপুরি নিভে যায় না। সর্বানন্দ মধুর মতো মানুষদের হাত ধরেই গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা বায়োস্কোপ এখনও টিকে আছে মানুষের স্মৃতি ও ভালোবাসায়।