বাটাজোড়-সরিকল খাল খননে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে নতুন সম্ভাবনা; রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্ব দিচ্ছে উপজেলা প্রশাসন
সোলায়মান তুহিন, গৌরনদী (বরিশাল):
বরিশালের গৌরনদী উপজেলার বাটাজোড়–সরিকল প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল পুনঃখননের সুফল ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন নাব্যতা হারিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়া খালটি পুনঃখননের ফলে কৃষি, সেচব্যবস্থা, মৎস্যসম্পদ, পানি নিষ্কাশন এবং পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা দেখছেন স্থানীয়রা। কৃষকদের ভাষ্য, খালটি পুনঃখননের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও সেচ সংকট অনেকটাই দূর হয়েছে এবং কৃষি উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, বছরের পর বছর পলি জমে খালটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ত, আবার শুষ্ক মৌসুমে সেচের অভাবে কৃষকরা চরম ভোগান্তিতে পড়তেন। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় মাছের প্রজনন ও জলজ পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হতো। পুনঃখননের পর খালটি আবারও পানি ধারণ ও স্বাভাবিক প্রবাহের সক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা তৈয়ব আলী শেখ বলেন, এই খাল পুনঃখনন আমাদের কৃষির জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আগে সময়মতো জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন ছিল। এখন সেচব্যবস্থা সহজ হয়েছে, কৃষকরা অধিক জমিতে আবাদ করতে পারবেন। এতে উৎপাদন বাড়বে এবং কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হবে।
কৃষক নিতাই মালি বলেন, আগে বছরে দুইবার ফসল ফলানো যেত। এখন পর্যাপ্ত পানি পাওয়ার কারণে তিনটি মৌসুমেই চাষাবাদের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এটি আমাদের জন্য বড় একটি অর্জন।
স্থানীয় কৃষক মো. কামাল ফকির বলেন, খাল পুনঃখননের সুফল শুধু কৃষিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরে আসায় দেশীয় মাছের উৎপাদনও বাড়বে। কৃষি ও মৎস্য—দুই খাতেই এই খাল এলাকার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
স্থানীয় বাসিন্দা অধীর বর্ধন বলেন, খালটি পুনঃখননের ফলে পানির প্রবাহ অনেক বেড়েছে। এতে কৃষি ও মৎস্য খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। এলাকাবাসী এই উদ্যোগে অত্যন্ত আনন্দিত এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি সুফল পাওয়ার আশা করছেন।
গত ১৩ জুলাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান গৌরনদীর পুনঃখননকৃত বাটাজোড়-সরিকল খালের তীরে নারিকেল গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। একই অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন একটি নিমগাছের চারা রোপণ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী খালের দুই তীরে রোপণ করা গাছের নিয়মিত পরিচর্যা এবং পরিবেশ সংরক্ষণে জনসম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রধানমন্ত্রী ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর রোপণ করা গাছগুলোর পরিচর্যা বর্তমানে গৌরনদী উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে নিয়মিতভাবে করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইব্রাহিম বলেন, এই ১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের মূল উদ্দেশ্য ছিল পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা। খালের দুই তীরে রোপণ করা গাছগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা উপজেলা প্রশাসন নিশ্চিত করছে। কোথাও খালের পাড় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা বা ক্ষয়ক্ষতি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় এই খাল ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির সুফল দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে আমরা আশাবাদী।
স্থানীয়দের মতে, খালের দুই তীরে রোপণ করা গাছগুলো বড় হলে মাটি ক্ষয়রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, বাটাজোড়–সরিকল ১০ কিলোমিটার খালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ, সেচব্যবস্থা, নৌ-যোগাযোগ এবং পরিবেশ-সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাদের বিশ্বাস, এই প্রকল্প দক্ষিণাঞ্চলের টেকসই কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার একটি সফল দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।





















